লাখো মানুষের ঢলে চিরনিদ্রায় জুলাই বিপ্লবী শহীদ শরীফ ওসমান হাদি

গণমঞ্চ নিউজ ডেস্ক –

পুরো বাংলাদেশকে শোকে ভাসিয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই বিপ্লবের শহীদ শরীফ ওসমান হাদি। গতকাল শনিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন জাতীয় ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে দুপুর আড়াইটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ মানুষ জানাজায় অংশ নেন এবং হাদির আদর্শ ও আজাদির সংগ্রাম অব্যাহত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত আবেগঘন বক্তব্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “প্রিয় হাদি, তুমি হারিয়ে যাবে না। তুমি সব বাংলাদেশির বুকের ভেতর বেঁচে থাকবে।” এ সময় মরহুমের বড় ভাই ড. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, হাদির হত্যাকারী ও তাদের সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই পরিবারের একমাত্র দাবি। তিনি বলেন, “সরকার বা কারও কাছে আমাদের কিছু চাওয়ার নেই। আমরা শুধু আমার ভাইয়ের রুহের মাগফিরাত এবং তার রেখে যাওয়া আট মাসের সন্তানের জন্য দোয়া চাই।”

একই দিনে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা, রংপুর, বগুড়া, কক্সবাজার, ঝালকাঠী ও নওগাঁসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাদির গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেসব স্থানেও মানুষের ঢল নামে।

জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের সবুজ মাঠে জানাজা হলেও মানুষের উপস্থিতি মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, আসাদগেট, মনিপুরীপাড়া ও আশপাশের এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী জানাজায় অংশ নেন। শোকাহত মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হয় নানা স্লোগান, যা হাদিকে একটি ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত করে।

জানাজাকে কেন্দ্র করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুলিশ, র‍্যাব, আনসার ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যবহার করে আধুনিক প্রযুক্তি ও বডি-ওর্ন ক্যামেরা।

বেলা সাড়ে ১২টার পর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গ থেকে হাদির মরদেহ সংসদ ভবন এলাকায় আনা হয়। মরদেহ বহনকারী গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে শোকমিছিল এগিয়ে চলে জানাজার মাঠের দিকে। প্রতিটি মুহূর্তে শোক আর অশ্রুতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

জানাজা শেষে বিকাল পৌনে তিনটার দিকে মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে নেওয়া হয়। কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি প্রাঙ্গণে বিকাল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে তার দাফন সম্পন্ন হয়। দাফনকালে উপস্থিত সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজার আগে শহীদের কফিন সামনে রেখে সমর্থকরা আগ্রাসন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেন। তারা বলেন, হাদির রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না এবং তিনি যে ইনসাফভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়ন করেই ছাড়বেন।

জানাজা ও দাফন শেষে রাজধানীর শাহবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। সেখানে শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন এবং হাদির হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার দাবি করেন।

উল্লেখ্য, ৩২ বছর বয়সি ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *