ভ্রূণতত্ত্ব ও মানব সৃষ্টির ধাপ: কোরআনের বর্ণনা ও আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার

মাওঃ শামীম হুসাইন কেরানীগঞ্জ থেকে

মানবজাতির সৃষ্টি ও বিকাশ মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম কৌতূহলের একটি বিষয়। মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে নিজের উৎপত্তি ও জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর চিন্তা করেছে। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তি আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত মানব ভ্রূণ (Embryo) কীভাবে মায়ের গর্ভে বৃদ্ধি পায়, তা মানুষ বিস্তারিতভাবে জানতো না। আশ্চর্যের বিষয়, ১৪০০ বছরেরও বেশি আগে অবতীর্ণ পবিত্র কোরআনে মানব ভ্রূণতত্ত্বের বিভিন্ন ধাপ এমনভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আজকের আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিলে যায়।

কোরআনের বর্ণনা

আল্লাহ তা’আলা কোরআনে বলেনঃ

“আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি তাকে স্থাপন করেছি নিরাপদ আবাসে শুক্রবিন্দু হিসেবে। তারপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে (علقা) পরিণত করেছি; এরপর সেই জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে (مضغة) রূপান্তর করেছি; পরে সেই মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি; তারপর অস্থিকে মাংস দিয়ে আবৃত করেছি। পরে আমরা তাকে আরেকটি সৃষ্টিতে রূপ দিয়েছি। সুতরাং মহিমান্বিত আল্লাহ, সৃষ্টিকর্তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।”
(সূরা আল-মু’মিনূন, ২৩: ১২–১৪)

এই আয়াতের প্রতিটি শব্দ ভ্রূণ বিকাশের একটি নির্দিষ্ট ধাপকে নির্দেশ করে।

ধাপ ১: নুতফাহ (نُطْفَة) – শুক্রবিন্দু

‘নুতফাহ’ শব্দের অর্থ অতি ক্ষুদ্র পানির ফোঁটা। আধুনিক বিজ্ঞানে এটি মানুষের শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনকে নির্দেশ করে। এক মিলিলিটার বীর্যে প্রায় ২০০-৫০০ মিলিয়ন শুক্রাণু থাকে, কিন্তু মাত্র একটি শুক্রাণুই ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়ে ভ্রূণের সূচনা ঘটায়।

বিজ্ঞান বলছে, গর্ভধারণের সূচনাই আসলে “নুতফাহ” ধাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ধাপ ২: আলাকা (عَلَقَة) – ঝুলে থাকা জমাট রক্ত

কোরআনে ব্যবহৃত “আলাকা” শব্দের তিনটি অর্থ রয়েছে: ঝুলে থাকা বস্তু, জোঁকের মতো জীব, জমাট রক্ত
আধুনিক গবেষণা বলছে, ভ্রূণ মায়ের গর্ভাশয়ে আস্তে আস্তে দেয়ালে ঝুলে থাকে এবং জোঁকের মতো মায়ের রক্ত থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে। এই ধাপটি গর্ভধারণের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহে ঘটে।

প্রখ্যাত ভ্রূণতত্ত্ববিদ ড. কিথ মুর (Prof. Keith Moore) কোরআনের এই বর্ণনাকে “astonishingly accurate” বলেছেন।

ধাপ ৩: মুদগাহ (مُضْغَة) – চিবানো মাংসপিণ্ড

প্রায় ২৬–৩০ দিন পর ভ্রূণ দেখতে অনেকটা দাঁতের দাগযুক্ত চিবানো মাংসপিণ্ডের মতো লাগে। ভ্রূণের আকৃতি একেবারেই “মুদগাহ” শব্দটির সাথে মিলে যায়। আধুনিক আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করে এই মিল সহজেই দেখা যায়।

ধাপ ৪: ইযাম (عِظَام) – হাড় সৃষ্টি

পঞ্চম সপ্তাহের পর থেকে ভ্রূণে হাড় তৈরি শুরু হয়। হাড়কে প্রথমে নরম কাঠামো আকারে গঠন করা হয়, এরপর ধীরে ধীরে ক্যালসিফাই হয়ে শক্ত হাড়ে পরিণত হয়।

ধাপ ৫: লাহম (لَحْم) – হাড়কে মাংস দিয়ে আবৃত করা

হাড় তৈরি হওয়ার পর তার চারপাশে মাংসপেশী (Muscles) তৈরি হতে শুরু করে। এটি কোরআনের ভাষায় – “فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا” (আমরা অস্থিকে মাংস দ্বারা আবৃত করেছি)।

ধাপ ৬: নাশ’আ খালকান আখার (نَشْأَةً أُخْرَى) – এক ভিন্ন সৃষ্টি

সব ধাপ অতিক্রম করার পর আল্লাহ বলেন, “আমি তাকে এক ভিন্ন সৃষ্টিতে রূপ দিলাম।” এই ধাপটি মানব ভ্রূণের বিশেষ বৈশিষ্ট্য অর্জনের সময়কে নির্দেশ করে। এখানে মানবিক আত্মা ফুঁকে দেওয়া হয় (অনেক আলেমের মতে গর্ভধারণের ১২০ দিন পর), এবং শিশুটি অনন্য মানব হিসেবে পরিচিতি পায়।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোরআনের বর্ণনা

আধুনিক বিজ্ঞানীরা যখন কোরআনের এই আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করেন, তারা অভিভূত হয়ে যান। কানাডার প্রখ্যাত বিজ্ঞানী প্রফেসর কিথ মুর বলেন –“The description of the human embryo in the Quran is remarkably accurate, considering it was written in the 7th century. This proves that the Quran is not the work of any human.”

এছাড়াও অন্যান্য ভ্রূণতত্ত্ববিদ যেমন ড. জো লেইটন এবং ড. মার্শাল জনসন কোরআনের বর্ণনা ও আধুনিক বিজ্ঞানকে একে অপরের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলেছেন।

ইসলাম ও বিজ্ঞান – সমন্বিত বার্তা

মানব সৃষ্টির প্রতিটি ধাপ কেবল জৈবিক প্রক্রিয়া নয়, বরং আল্লাহর মহাশক্তির নিদর্শন। ইসলাম মানুষকে শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল মেটানোর আহ্বান জানায় না, বরং সৃষ্টির রহস্য থেকে আল্লাহর মহত্ত্বকে উপলব্ধি করতে বলে।

“হে মানুষ! যদি তোমরা পুনরুত্থান নিয়ে সন্দেহ কর, তবে আমি তোমাদের সৃষ্টি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করলাম…” (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৫)

ভ্রূণতত্ত্ব ও মানব সৃষ্টির ধাপ নিয়ে কোরআনের বর্ণনা আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে এক চমৎকার সমন্বয় তৈরি করেছে। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, ৭ম শতাব্দীতে বসবাসকারী কোনো মানুষের পক্ষে এত সূক্ষ্ম ভ্রূণগত বিবরণ জানা সম্ভব ছিল না।

অতএব, এই দৃষ্টান্ত শুধু ইসলাম ও বিজ্ঞানের সামঞ্জস্যই প্রমাণ করে না; বরং মানবজাতির প্রতি আল্লাহর পাঠানো এক চিরন্তন বার্তারই সাক্ষ্য বহন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *