গণমঞ্চ ডেস্ক নিউজ
মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো দুবার সমাধান হয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা সফররত পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। গতকাল রোববার ঢাকায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ দাবি করেন তিনি। তবে এ দাবির সঙ্গে একমত নয় বাংলাদেশ। ঢাকা চায়, একাত্তরের গণহত্যার জন্য পাকিস্তান ক্ষমা প্রার্থনা করুক। অন্য দুটি অমীমাংসিত বিষয়েরও সমাধান করুক।
গতকাল সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন মো. তৌহিদ হোসেন। আর পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ইসহাক দার।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একাত্তরের অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন করলে ইসহাক দার বলেন, ১৯৭৪ সালে প্রথমবার সমস্যাটি লিখিতভাবে সমাধান হয়েছিল। নথিটি ঐতিহাসিক, তা উভয় দেশের কাছেই রয়েছে। এরপর জেনারেল পারভেজ মোশাররফ বাংলাদেশ সফরে খুব খোলাখুলি এবং অকপটে সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা করে গেছেন। আমি মনে করি, একটি পরিবারের ভাইদের মধ্যে একবার কোনো বিরোধের সমাধান হয়ে গেলে, এমনকি ইসলামেও আমাদের ‘দিল পরিষ্কার’ করতে বলা রয়েছে। সুতরাং, চলুন সামনে এগিয়ে যাই। আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে।
ইসহাক দার এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, ২০০২ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ যখন বাংলাদেশ সফর করেছিলেন, সমস্যাটি তখন দ্বিতীয়বারের মতো সমাধান করা হয়েছিল। সেই সময় পারভেজ মোশাররফ সব বাংলাদেশির কাছে অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। ফলে আমি মনে করি, ধর্ম যা বলে, ইসলামিক শিক্ষা যা বলে তাহলো, আমাদের মন পরিষ্কার থাকা উচিত। একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া উচিত। আমাদের মধ্যে দুর্দান্ত সম্ভাবনা আছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিদেশীয় চুক্তি সই হয়। আর ২০০২ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ বাংলাদেশ সফর করেন। সেই সময় একাত্তরের গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বদলে দুঃখ প্রকাশ করেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অনেক বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক পারস্পরিক সহযোগিতার মতো বিষয় ছিল। বৈঠকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ঐক্য ছিল; আমাদের মধ্যে মতভেদ ছিল না, যা অত্যন্ত স্বস্তির বিষয়।
ইসহাক দার বলেন, আজ দুই দেশ একটি চুক্তি ও পাঁচটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক এবং অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীর ভিসা মওকুফ করা হয়েছে। আর উভয় দেশের সাধারণ নাগরিকের জন্য ভিসা ব্যবস্থা এরই মধ্যে সহজ করা হয়েছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে ভিসা অন অ্যারাইভাল বা ২৪ ঘণ্টার ভিসা প্রক্রিয়া চালু করেছে।
ইসহাক দার বলেন, আমরা বহুপক্ষীয় ফোরামে একসঙ্গে কাজ করার সংকল্প করেছি। আন্তর্জাতিক ফোরামে বেশ ঘন ঘন মিলিত হচ্ছি। আমরা অর্থনীতির ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করতে পারি। আমরা অর্থনৈতিক বাণিজ্য সম্পর্কের নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর জন্য কাজ করছি।
একাত্তরের অমীমাংসিত ইস্যু দুইবার সমাধান হয়ে গেছে– ইসহাক দারের এমন দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, ৫৪ বছরের সমস্যা এক দিনের বৈঠকে সমাধান হবে না। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ১৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হলো। তখন পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানী খার এসেছিলেন দাওয়াত দিতে; দ্বিপক্ষীয় সফরে নয়। কাজেই এখানে বসে এক ঘণ্টায় আমরা এটা সমাধান করে ফেলতে পারব– এটা আপনারা নিশ্চয়ই আশা করবেন না।
উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একাত্তরের অমীমাংসিত তিনটি বিষয় নিয়ে পরস্পরের অবস্থান তুলে ধরেছি। একটি বিষয় শুধু আলোচনা হয়েছে। যেটা খানিকটা অগ্রগতি হিসেবে বলা যায়, সেটি হলো– দুপক্ষই একটি বিষয় ঠিক করেছি– অমীমাংসিত বিষয়গুলো আমাদের সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যাতে বাধাহীন এগোতে পারে। এ জন্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধান করে পেছনে ফেলতে হবে। দুই পক্ষই এতে একমত হয়েছি, আমরা এ নিয়ে কথা বলব এবং চেষ্টা করব বিষয়গুলো যেন আগামীতে বা কোনো এক পর্যায়ে সমাধান হয়। হুট করে আমরা এক দিনে বসে এটা সমাধান করতে পারব না।
একাত্তরের অমীমাংসিত ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান কি একই? উত্তরে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অমীমাংসিত ইস্যুতে দুই দেশ তাদের নিজেদের অবস্থানটাই পুনর্ব্যক্ত করেছে।
নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে কি তারা একমত? উত্তরে তিনি বলেন, না। আমরা নিজ নিজ অবস্থান জানিয়েছি। আমরা দুই পক্ষ একমত হয়েছি– বিষয়গুলো আলোচনা করে সমাধান করা প্রয়োজন, যাতে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগুলো বাধা না হয়।
একাত্তরের অমীমাংসিত ইস্যু সমাধান হয়ে গেছে– ইসহাক দারের এ দাবির সঙ্গে কি বাংলাদেশ একমত? উত্তরে তৌহিদ হোসেন বলেন, আমি অবশ্যই একমত না। একমত হলে তো সমস্যাটা সমাধান হয়ে যেত। আমি তো বললাম, আমরা আমাদের অবস্থানটা বলেছি; উনারা উনাদেরটা বলেছেন।
অমীমাংসিত ইস্যুতে বাংলাদেশ বৈঠকে কী বলেছে– জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, হিসাব হোক এবং আমাদের টাকাপয়সার যে ব্যাপার, সেটা সমাধান হোক। আমরা চাই, এখানে যে গণহত্যা হয়েছে, সেটার ব্যাপারে তারা দুঃখ প্রকাশ করুক, মাফ চাক। আমরা চাই যে আটকে পড়া মানুষগুলো (পাকিস্তানি নাগরিক) আছে, তাদের তারা ফেরত নিয়ে যাক।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের ত্রিদেশীয় কৌশলের প্রভাব কিনা– জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, এক শব্দে এটার উত্তর– ‘না’। ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থাটাতে চীনের উৎসাহ আছে, পাকিস্তানেরও উৎসাহ আছে। আমরা বলেছি, এভাবে ত্রিপক্ষীয় না। আপনারা চতুর্পক্ষীয় করেন। আরও দেশকে নিয়ে আসেন। আমরা একসঙ্গে বসব। আমাদের সেই অবস্থান এখনও আছে। এটা তারা কিন্তু আমলে নিয়েছে। আগামীতে হয়তো সেটা হবে। এ কারণে আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করছি, তা না।
উপদেষ্টা বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক গত সরকারের আমলে ইচ্ছা করে পিছিয়ে রাখা হয়েছিল। আমরা একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক চাই। পাকিস্তানের সঙ্গে যেমন, আমরা অন্যান্য বন্ধু দেশের সঙ্গে ঠিক সে রকমই চাই। এর চেয়ে বেশি কিছু না।
দ্রুত সমাধানের আহ্বান ঢাকার
বৈঠকের পর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান করতে পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালে গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়া, সম্পদের বণ্টন, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বৈদেশিক সাহায্য হস্তান্তর, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের প্রত্যাবাসনসহ দীর্ঘকাল ধরে অমীমাংসিত ঐতিহাসিক বিষয়গুলো নিয়ে টেকসই এবং দূরদর্শী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি সম্পর্কে একটি দৃঢ় ভিত্তি স্থাপনের জন্য দ্রুত সমাধান করবে পাকিস্তান।
‘পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঔদ্ধত্যপূর্ণ’
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশের ‘দিল পরিষ্কার’ করার বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। গতকাল এক বিবৃতিতে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ১৯৭১ সালে গণহত্যার দায় স্বীকার করে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার বিপরীতে বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে এমন বক্তব্য ঔদ্ধত্যপূর্ণ এবং বাংলাদেশের জন্য চরম অপমানজনক।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ঘিরে পাকিস্তানের তৎপরতা ও কথাবার্তার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান এমন একটি ভাব প্রকাশ করছে– তারা সাবেক পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার করে ফেলেছে। বাংলাদেশ ঘিরে পাকিস্তানের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য ও অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণকে সজাগ থাকতে হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তানের উচিত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী দ্বারা সংঘটিত ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যার সকল দায় স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া।
এক চুক্তি ও পাঁচ সমঝোতা স্মারক সই
গতকাল পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে এক চুক্তি ও পাঁচ সমঝোতা স্মারক সই হয়। এগুলো হলো– কূটনৈতিক ও অফিসিয়াল পাসপোর্টধারীর জন্য ভিসা বাতিলের চুক্তি; সাংস্কৃতিক বিনিময়, সংবাদ সংস্থা, ফরেন সার্ভিস একাডেমি, দুদেশের থিঙ্কট্যাঙ্ক এবং বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে সমঝোতা স্মারক।
বৈঠকে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ জ্ঞান করিডোর’ চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। যার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষার জন্য ৫০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেওয়া হবে। এই বৃত্তির এক-চতুর্থাংশ চিকিৎসাক্ষেত্রে দেওয়া হবে। তিনি বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনের সময় আহত ৪০ শিক্ষার্থীর অঙ্গ প্রতিস্থাপনসহ উন্নত চিকিৎসার জন্য পাকিস্তানের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন। পাকিস্তান হকি দলের প্রশিক্ষণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।
যত দ্রুত সম্ভব ফ্লাইট চালু
একই হোটেলে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে আলাদা বৈঠকের পর দুই দেশের ফ্লাইট চালু নিয়ে পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ফ্লাইট চালু করা হবে। দুই মাসের মধ্যে এই রুট চূড়ান্ত করা হবে।
এদিকে গতকাল দুপুরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং আমাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও বহুমাত্রিক। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বিদ্যমান সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে বৈঠকে।
দুদিনের সফরে গত শনিবার দুপুরে ঢাকা এসেছিলেন ইসহাক দার। পাকিস্তানের বাণিজ্যমন্ত্রী জাম কামাল খান গত ২১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ সফরে রয়েছেন। গতকাল রোববার রাতে ঢাকা ত্যাগ করেন তারা।
