জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং গণমাধ্যম অধিকার সংগঠনগুলো সোমবার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে গাজায় আল জাজিরার সংবাদকর্মীদের ওপর ইসরায়েলি হামলার, যেখানে সাংবাদিক আনাস আল-শরীফসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক মোহাম্মদ আল-খালদিও একই হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া জানান।
রোববারের এই হামলায় নিহতদের স্মরণে গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের আঙিনায় ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানায় অসংখ্য ফিলিস্তিনি। নীল রঙের সাংবাদিকদের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরা শোকসন্তপ্তরা মরদেহগুলো সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায় সরু গলিপথ দিয়ে কবরস্থানে নিয়ে যান।
ইসরায়েল স্বীকার করেছে যে তারা ২৮ বছর বয়সী আল জাজিরা সাংবাদিক আনাস আল-শরীফকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল এবং দাবি করেছে তিনি হামাসের সদস্য ছিলেন ও “সাংবাদিক সেজেছিলেন”। ইসরায়েলের সামরিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিনি একটি হামাস সেলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট হামলার পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন।
আল জাজিরা জানিয়েছে, এই হামলায় নিহত বাকি চারজন হলেন প্রতিবেদক মোহাম্মদ কুরাইকে এবং ক্যামেরাপার্সন ইব্রাহিম জাহের, মোহাম্মদ নুফাল ও মোআমেন আলিওয়া। হামলাটি আল-শিফা হাসপাতালের মূল ফটকের বাইরে সাংবাদিকদের জন্য স্থাপিত একটি তাঁবুতে হয়েছিল।
স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, কর্মজীবনের শুরুতে শরীফ গাজা শাসনকারী হামাসের যোগাযোগ কার্যালয়ে কাজ করতেন, যেখানে তার ভূমিকা ছিল দলের আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো প্রচার করা। এরপর তিনি আল জাজিরায় যোগ দিয়ে গাজায় চলমান ২২ মাসের যুদ্ধের প্রতিদিনের প্রতিবেদন দিতেন।
গণমাধ্যম স্বাধীনতা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো এই হামলাকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কালাস বলেন, “ইইউ পাঁচজন আল জাজিরা সাংবাদিক হত্যার নিন্দা জানাচ্ছে।”
শরীফের মৃত্যুর পর তার এপ্রিল মাসে লেখা একটি বার্তা অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন, “আমাকে নীরব করা হয়েছে, গাজাকে ভুলে যেও না।” গত জুলাইয়ে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) তার সুরক্ষার আহ্বান জানায়। সংগঠনটি অভিযোগ করে, ইসরায়েল বারবার সাংবাদিকদের ‘যোদ্ধা’ আখ্যা দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করছে কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিচ্ছে না।
আল জাজিরা এই হামলাকে “ইসরায়েলি দখল উন্মোচনকারী কণ্ঠগুলোকে নীরব করার মরিয়া প্রচেষ্টা” বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি শরীফকে “গাজার অন্যতম সাহসী সাংবাদিক” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
রিপোর্টার্স উইদআউট বর্ডার্স জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, শুধু মাঝে মাঝে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সফরের অনুমতি দেয়।
হামলার কয়েকদিন আগে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা গাজা সিটি ও আল-মাওয়াসি এলাকায় সেনা অভিযান চালানোর পরিকল্পনা অনুমোদন করে, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। জার্মানি অস্ত্র সরবরাহ স্থগিত করেছে এবং অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব মিরোস্লাভ জেনচা সতর্ক করে বলেছেন, এই অভিযান গাজায় “আরেকটি মানবিক বিপর্যয়” ডেকে আনবে। গত মাসে জাতিসংঘ জানিয়েছিল, ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি অভিযানে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬১,৪৯৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যা জাতিসংঘও বিশ্বাসযোগ্য বলেছে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের হামাস আক্রমণে ইসরায়েলে ১,২১৯ জন নিহত হয়েছিলেন।
