কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) সংবাদদাতা
ঢাকার কেরানীগঞ্জে বাড়ি ভাড়া নিতে জাতীয় পরিচয়পত্র বা প্রয়োজনীয় তথ্য না লাগায় এলাকার অনেক ভাড়া বাসাই এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন ভাড়াটিয়ার তথ্য থানায় জমা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বেশির ভাগ বাড়িওয়ালাই তা মানছেন না। এতে অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। আর কোনো অপরাধ ঘটলে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে।
রাজধানীর লাগোয়া বুড়িগঙ্গার পাড়ে গড়ে ওঠা ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা। এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। উপজেলার কদমতলী, জিনজিরা, শুভাঢ্যা, কালিন্দী ও আগানগর ইউনিয়ন সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে,কেরানীগঞ্জ এখন ভাসমান মানুষের শহর। যার ফলে অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানাগেছে, গত ২৫ এপ্রিল দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পূর্ব আগানগর বাঘাবাড়ি এলাকায় বীথি আক্তার নামে এক নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে জানা যায়, বীথি তাঁর প্রাক্তন স্বামী মহিউদ্দিনের সঙ্গে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগ এলাকার এক বাসায় ভাড়া থাকতেন। পরিচয়পত্র ছাড়াই তাঁদের ওই বাসা ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। তদন্তে বের হয়, বীথি ও তাঁর চার বছরের ছেলে, পাশাপাশি সাবলেট ভাড়াটে নূপুর আক্তারকে হত্যা করে মহিউদ্দিন। পুলিশের ভাষায়, বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার সঠিক পরিচয় রাখলে তদন্তে আরও সুবিধা হতো।
গত জুলাইয়ে কালিন্দী ইউনিয়নের চড়াইল এলাকায় রনি মিয়ার ভাড়া বাড়িতে “গ্যারেজ মালিক” পরিচয়ে এক ব্যক্তি ঘর ভাড়া নেন। পরে আশুলিয়া থানার পুলিশের হাতে সেই ব্যাক্তি ধরা পড়লে জানা যায়, তিনি আসলে অটোরিকশা ছিনতাই চক্রের হোতা। তাঁর কাছ থেকে চুরি হওয়া আটটি অটোরিকশা উদ্ধার করা হয়। বাড়িওয়ালা তখনও জানতেন না তাঁর ভাড়াটিয়ার প্রকৃত নাম।
একই এলাকায় গত ১০ অক্টোবর জামিল নামে এক যুবককে খুঁজতে আসে কয়েকজন। পরে তাঁকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে আটক করে পুলিশ। বাড়ির মালিক জানতেন না, তাঁর ভাড়াটিয়া জামিল আসলে একজন পলাতক আসামি। এমনকি বাড়ি ভাড়া দেয়ার সময় তার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কোনো কাগজও নেননি বাড়িওয়ালা।
কালিন্দীর ভাংনা এলাকার বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, আমাদের পাশের বাড়িতে এক দম্পতি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। একদিন স্বামী স্ত্রীকে কুপিয়ে রেখে পালিয়ে যায়। পুলিশ এসে ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে বাড়িওয়ালা কিছুই বলতে পারেননি। এখনও অনেক বাড়িওয়ালা একই কাজ করছে। এতে এলাকাবাসী আতঙ্কে আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ভাড়াটিয়ার তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে কেরানীগঞ্জে এখন অপরাধীদের আশ্রয়স্থয় হিসেবে গড়ে উঠছে। অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়া পেলেই খুশি, তাঁরা পরিচয়পত্র বা ভাড়াটিয়ার পেশা পর্যন্ত জানতে চান না। অপরাধীরা এই সুযোগেই নিজেদের গোপন রাখে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শুভাঢ্যা পূর্ব পাড়া এলাকার এক বাড়িওয়ালা বলেন, আমার বাসা একটু ভিতরে। ভাড়াটিয়া পাওয়া কঠিন। তাই কেউ ভাড়া নিতে এলে ভাড়া পেলেই রাজি হয়ে যেতাম। আগে এসব বিষয় খেয়াল করতাম না। এখন ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে ভোটার আইডি নিয়ে তবেই ভাড়া দেব।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর কেরানীগঞ্জ উপজেলা শাখার সমন্বয়ক কাওসার আহমেদ বলেন, অপরাধীরা সবসময় নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে চায়। কারণ পরিচয় আড়াল থাকলে এক জায়গায় অপরাধ সংঘটিত করে অন্য যায়গায় গিয়ে নির্বিঘ্নে বসবাস করা সহজ। অপরাধীরা বেশি ভাড়া দিয়ে ফ্ল্যাট ভাড়া নিতে পারে। তাই কেরানীগঞ্জের অনেক বাড়িওয়ালা অতিরিক্ত ভাড়ার লোভে ভাড়াটিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া ভাড়া দেয়। এতে সমাজে অপরাধ বাড়ছে। প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করা বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাহলে অন্যান্য বাড়িওয়ালারা সতর্ক হবেন।
কালিন্দী এলাকার বাসিন্দা ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সোহেল মোল্লা বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২ ধারায় পুলিশ তদন্তের প্রয়োজনে জনগণের কাছ থেকে তথ্য চাইতে পারে, আর জনগণও তা দিতে বাধ্য। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য না দিলে দণ্ডবিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কেরানীগঞ্জ সার্কেল) জাহাঙ্গীর আলম ইত্তেফাককে বলেন, নতুন ভাড়াটিয়া আসলে বাড়িওয়ালাকে অবশ্যই তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে থানা থেকে দেওয়া সিআইএমএইচ ফর্মে তথ্য পূরণ করতে হয়। এসব তথ্য আমাদের ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু কিছু মালিক দায়িত্ব এড়িয়ে যান। নিরাপত্তার স্বার্থে সকল বাড়ির মালিকদের এ নির্দেশনা মানা উচিত। তিনি আরও বলেন, ভাড়াটিয়াদের তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে বাড়িওয়ালাদের ভাড়া নিশ্চিত করা উচিত। এছাড়া ভাড়াটিয়াদের আচরণ ও কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা দরকার। কারও আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে থানায় অবগত করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে এটি জরুরী। অপরাধ নির্মূলে সকলের সহযোগিতা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন।
